ক্রিমিয়া উপদ্বীপে রাশিয়ার সামরিক ও বেসামরিক জ্বালানি সরবরাহের পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে এক নজিরবিহীন ড্রোন অভিযান শুরু করেছে ইউক্রেন। গত কয়েক দিনে কৃষ্ণসাগর এবং আজভ সাগরে রাশিয়ার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তেল ট্যাঙ্কার ও বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় বাহিনী, যা ক্রেমলিনের জন্য এক বড় লজিস্টিক বিপর্যয় তৈরি করেছে।
ইউক্রেনের ড্রোন কমান্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই “লজিস্টিক লকডাউন” বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ কৌশলের অংশ হিসেবে মাত্র চার দিনের ব্যবধানে আজভ সাগরে রাশিয়ার প্রায় ২৫টি থেকে ৩৬টি জাহাজে আঘাত হানা হয়েছে। যার মধ্যে বড় একটি অংশ রাশিয়ার তথাকথিত “শ্যাডো ফ্লিট” বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত গোপন বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কার।
ইউক্রেনীয় ড্রোন বাহিনীর প্রধান রবার্ট ব্রোভডি (যিনি ‘ম্যাগিয়ার’ নামে পরিচিত) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই অভিযানের বেশ কিছু ভিডিও ও প্রমাণ প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, ভেনেরা-৩, সানার-১, ক্লিমেনা এবং পেনেলোপার মতো বড় বড় রুশ তেল ট্যাঙ্কারগুলো এই হামলার শিকার হয়েছে। এমনকি ‘এসকেএস ওয়ান’ নামক একটি যাত্রীবাহী ফেরি এবং ‘ব্লু’ নামক একটি বড় ট্যাঙ্কারেও নিখুঁতভাবে নৌ ড্রোন (Naval Drone) দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।
রাশিয়ার ভেতরে তীব্র ক্ষোভ ও নৌবাহিনীর ব্যর্থতা
ইউক্রেনের এই আকস্মিক ও তীব্র আক্রমণের মুখে রুশ সামরিক বিশ্লেষক এবং যুদ্ধসমর্থক টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলো (যেমন ‘মেইল্টারি ইনফরম্যান্ট’ ও ‘রাইবার’) তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহর এখন পুরোপুরি আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে চলে গেছে এবং নভোরোসিস্ক বন্দরে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছে। ফলে সাগরে চলাচলকারী রুশ বাণিজ্যিক ও জ্বালানি জাহাজগুলো ইউক্রেনীয় ড্রোনের কাছে একেকটি সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এদিকে রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলের গভর্নর ইউরি স্লাইউসার তাগানরোগ উপসাগরে দুটি ট্যাঙ্কারে হামলার সত্যতা স্বীকার করেছেন। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবিতেও ক্রিমিয়া উপকূলের কাছাকাছি সাগরে রুশ জাহাজ থেকে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা গেছে, যার কারণে ওই অঞ্চলের বাকি জাহাজগুলো জীবন বাঁচাতে দক্ষিণ দিকে পালিয়ে যাচ্ছে।
পুতিনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং রাশিয়ার জ্বালানি সংকট
এই হামলার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রিমিয়ার জন্য প্রতি মাসে ৭০,০০০ টন জ্বালানি নিশ্চিত করার যে গ্যারান্টি দিয়েছিলেন, ইউক্রেনের এই আক্রমণের ফলে তা এখন চরম ঝুঁকিতে। ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের বেশ কয়েকটি তেল শোধনাগার এবং তেলের ডিপো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় রাশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অঞ্চলে এখন তীব্র তেল সংকট দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে:
- রাশিয়ার বড় বড় শহর যেমন মস্কো এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে।
- রাশিয়ার সরকার বাধ্য হয়ে দেশ থেকে ডিজেল রপ্তানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।
- অধিকৃত ক্রিমিয়ায় বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ন্যাটো সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাথে বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের এই ড্রোন কৌশলকে সংঘাতের একটি বড় “উত্তেজনা” হিসেবে বর্ণনা করলেও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। ট্রাম্পের মতে, এই তীব্র চাপ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন, রাশিয়ার সাধারণ মানুষকেও বুঝতে হবে যে তাদের রাষ্ট্র একটি অন্যায় যুদ্ধ চালাচ্ছে, আর তাই রাশিয়ার ভেতরের অর্থনৈতিক ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক নিয়মের মধ্যেই পড়ে।
ইউক্রেন একদিকে রাশিয়ার স্থলপথের যোগাযোগ আগেই ভেঙে দিয়েছিল, আর এখন সমুদ্রপথও অবরুদ্ধ করে ফেলায় ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

