রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, এসব ব্যাংকে যাদের আমানত রয়েছে, তারা সুদসহ তাদের পুরো টাকা ফেরত পাবেন। জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে পুনর্গঠন, তদারকি জোরদার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, কোনো আমানতকারীকে তার অর্থ হারাতে হবে না এবং সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।
একীভূত হওয়া ইসলামি ধারার পাঁচটি সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য স্বস্তির বার্তা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানতের অর্থ থেকে কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ (কর্তন) করা হবে না। বরং আমানতকারীরা সুদসহ তাঁদের পুরো অর্থ ফেরত পাবেন। তবে এ জন্য কিছুটা সময় ও ধৈর্য ধরতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বুধবার জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য রেহানা আক্তার রানু উত্থাপিত নোটিশের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ আশ্বাস দেন।
‘গ্রাহকদের টাকা নিরাপদ, হেয়ারকাট হবে না’
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার কোনোভাবেই আমানতকারীদের ক্ষতির মুখে ফেলতে চায় না। তাই একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থের ওপর কোনো হেয়ারকাট আরোপ করা হবে না।
তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমানতকারীরা তাঁদের টাকা সুদসহ ফেরত পাবেন। তবে এই প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগবে। সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।”
কেন সময় লাগবে?
অর্থমন্ত্রী ব্যাখ্যা করে বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে রয়েছে এবং এখনো লোকসান বহন করছে। প্রতিদিনই সেই লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। ফলে যেসব ব্যাংক মূল আমানতই দ্রুত পরিশোধ করতে পারছে না, তাদের পক্ষে সুদসহ অর্থ ফেরত দেওয়া একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু আমানত ফেরত দেওয়া নয়, বরং পুরো ব্যাংকিং খাতকে আবারও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয়েছে নতুন ব্যাংক
অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের আওতায় সমস্যাগ্রস্ত পাঁচটি ইসলামি ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ গঠন করা হয়েছে।
এই একীভূতকরণের মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানত, দাবি ও গ্রাহকের স্বার্থ নতুন প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত রেজল্যুশন স্কিম অনুযায়ী ধাপে ধাপে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে।
দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যাংকগুলোর অনিয়ম ও অর্থ লুটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক অডিট চলছে। অডিট প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তাঁদের সম্পদ জব্দ ও অর্থ পুনরুদ্ধারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১১টি মামলার মধ্যে প্রথম ধাপে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, শিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও অরিয়ন গ্রুপের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে এই কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
সংসদে গ্রাহকদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন রেহানা আক্তার রানু
নোটিশ উত্থাপন করে রেহানা আক্তার রানু বলেন, এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের কারণে লাখো আমানতকারী তাঁদের কষ্টার্জিত টাকা তুলতে পারছেন না।
তিনি বলেন, প্রায় ৭৫ লাখ গ্রাহক সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। যাঁরা ব্যাংকের অর্থ লুট করে বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রির মাধ্যমে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তিনি। পাশাপাশি হেয়ারকাটের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তও বাতিলের আহ্বান জানান।
একই অধিবেশনে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন অভিযোগ করেন, বিগত দেড় দশকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বহু ব্যক্তি চাকরি নিয়েছেন।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক যাচাই-বাছাইয়ে ৯০ হাজার ৫২৭টি মুক্তিযোদ্ধা সনদের মধ্যে অন্তত ৮ হাজার সনদে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর দাবি, এসব ব্যক্তিকে দ্রুত চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
জবাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান বলেন, ভুয়া সনদ ব্যবহার করে যারা চাকরি ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেবে না।

